আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার পরিণতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী সংবাদ এবং শ্বাসরুদ্ধকর জল্পনা-কল্পনার মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে একটি খসড়া প্রকাশ করে আবারও পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে দিয়েছে।
যদিও কয়েক ঘণ্টা আগেই তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল যে তারা তাদের প্রস্তাবিত চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া এখনো ওয়াশিংটনে পাঠায়নি, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি চূড়ান্ত বিজয়ের আশায় আলোচনার সাফল্য হিসেবে এমন কিছু ধারা যুক্ত করেছে, যা প্রকৃতপক্ষে হয় ইরানের চিরাচরিত অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি, অথবা এমন কিছু বিষয়ে সীমারেখা টানা, যেগুলোকে তেহরান মর্যাদার রেড লাইন বা লাল রেখা বলে মনে করে।
ট্রাম্প যা বলে এবং ইরান যা নিশ্চিত করে, তার মধ্যেকার এই গভীর অমিল এটাই প্রমাণ করে যে কূটনীতির পথ এখনো মসৃণ হয়নি এবং হোয়াইট হাউস থেকে বর্তমানে যা বলা হচ্ছে তা বড় ধরনের ধাপ্পাবাজি।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবিগুলো সম্পূর্ণ একতরফা। ট্রাম্প এমন একটি সমঝোতার কথা বলছে যা পক্ষগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু সত্য হলো, গণমাধ্যমে প্রচারিত চৌদ্দটি প্রস্তাবের চূড়ান্ত খসড়া ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জমা দেয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও এই দাবিগুলোর জবাবে বিষয়টি জোর দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প যাকে চুক্তি বলে বর্ণনা করছে, তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে তার কোনোটিই চূড়ান্ত নয়।
দর কষাকষির মূলনীতি হলো, “সবকিছুতে একমত না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুতেই একমত হওয়া যায় না।” আলোচনার এই নিয়মটি হোয়াইট হাউসের বেছে বেছে করা দাবিগুলোকে কার্যকরভাবে দুর্বল করে দেয়।
যখন আমরা দাবিগুলোর মূল বিষয়ের কাছাকাছি যাই, তখন অসঙ্গতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন না করার অঙ্গীকারকে একটি নতুন তুরুপের তাস ও বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এই দাবিটি ইরানের দুই দশকের পারমাণবিক কূটনীতির মতোই পুরোনো।
তেহরান বারবার বলেছে যে তারা বোমা তৈরি করতে চায় না। এ বিষয়টি সাবেক সর্বোচ্চ নেতার সেই ধর্মীয় ফতোয়া দ্বারা সমর্থিত, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং, ট্রাম্প ইরানের পক্ষ থেকে যেটিকে নতুন ছাড় হিসেবে ঘোষণা করছেন, তা আসলে ইরানের কোনো পশ্চাদপসরণ নয় বরং ইরান তার আগের নীতিতেই রয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্পের দাবির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের সামুদ্রিক সীমানা সম্পর্কিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হরমুজ প্রণালীকে তার যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং কথিত মাইনগুলো নিষ্ক্রিয় করার অলীক স্বপ্নের কথা বলছেন; এমন একটি স্বপ্ন যা ইরান স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে, “হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের অবস্থায় আর কখনোই ফিরবে না।”
বাস্তব পরিস্থিতি হলো, যুক্তরাষ্ট্র তার সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উত্তেজনার এই দিনগুলোতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব কখনোই খর্ব করতে পারেনি। মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প "নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার" কথা বলেন, অথচ তিনি জানেন না যে এই বিষয়টিই ছিল যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। তেহরান বলছে যে, যতক্ষণ না তাদের জাহাজগুলো আগের মতো অবাধে চলাচল করতে পারছে এবং এই অবরোধ তুলে নেওয়া কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ তারা হরমুজ প্রণালীতে তাদের নজরদারি ব্যবস্থা পরিবর্তন করবে না।
হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র মাইন সংগ্রহ করছে বলে ট্রাম্পের করা দাবিটিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইরান এই জলপথে মাইনের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি, বরং জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার ওপর ধারাবাহিকভাবে জোর দিয়েছে।
অন্যদিকে, প্রশ্ন ওঠে যে মার্কিন সামরিক বাহিনী কীভাবে কথিত মাইনগুলো নিষ্ক্রিয় করতে পারল, যখন এই পুরো সময়টায় তারা অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালীতে তাদের নৌবহরও মোতায়েন করতে পারেনি?
মাইন অপসারণ করার ব্যাপারে ট্রাম্পের দাবির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা হাসিল করা। পারমাণবিক ইস্যুতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য ট্রাম্পের দাবিও কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত, তা তরলীকরণ হোক বা সংরক্ষণ, সম্পূর্ণরূপে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে। তবে, ইউরেনিয়াম ইস্যুতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি গোপন পিছুটানের আলামত হচ্ছে, ট্রাম্প এখন আর যুক্তরাষ্ট্র বা কোনো তৃতীয় দেশে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করার কথা বলছেন না, যার অর্থ হলো অন্তত এ ক্ষেত্রে বিতর্ক থেমে গেছে।
Your Comment